Home >> কুরআন ও হাদিস >> শরীয়ত আমরা কোত্থেকে শিখবো? (১ম পর্ব)

শরীয়ত আমরা কোত্থেকে শিখবো? (১ম পর্ব)

al-quran
একটি আশার কথা হলো আমাদের সমাজে ইসলাম পালন সম্পর্কে ধীরে ধীরে সচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে আধুনিক শিক্ষিত সমাজ এই দিকে ঝুঁকছেন কিছুটা। এটা আশার বাণী।
তাদের আরো একটি লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হচ্ছে ইসলাম সম্পর্কে তারা জানতে আগ্রহী। ইসলামের আহকাম ও বিধিবিধান তারা জেনেশুনে পালন করতে উৎসাহী। আমার কাছে ব্যাপারটা বেশ ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক মনে হয়। এটাকে সাধুবাদ জানাই এবং আমি আমার জায়গা থেকে জানানোর চেষ্টা করি। কারণ বিদায় হজের ভাষণে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে আমার কথাগুলো পৌঁছে দেয়।” এই হাদীসের উপর আমল করার জন্য হলেও চেষ্টা করি ইলম ছড়িয়ে দিতে। জ্ঞান বিতরণের চেয়ে আনন্দ কোনকিছুতে নেই।
এবার আসি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথায়। আমরা কার কাছ থেকে আহকামগুলো জানবো এবং কীভাবে জানবো? সবকিছু ই কি আমাকে দলীল সহ জানতে হবে? বা সব দলীল কি বুঝার যোগ্যতা আমার আছে? বা দলীল উল্লেখ না করা মানে কি সেই আহকামের কোন দলীল ই নেই?
বর্তমানে যেকোন কথার সাথে রেফারেন্স উল্লেখ করার একটা প্রচলন রয়েছে। এবং রেফারেন্স প্রদান করলে আমরা সবাই কথাটাকে স্বাচ্ছন্দ্যে মেনে নেই। তবে রেফারেন্সটা কতটুকু যথাযথ বা বাস্তবিক তা কেউ মিলিয়ে দেখার প্রয়োজনও বোধ করি না।
মূল কথা বুঝাতে প্রসঙ্গক্রমে ইলমে হাদীসের কিছু কথা বলি। একটা হাদীস বুঝতে হলে মূলত পাঁচটি কাজ করতে হয়।
  • প্রথমে হাদীসের সনদের রাবীদের নামগুলো যথাযথভাবে আয়ত্ব করতে হয়।
  • তারপর হাদীসে বর্ণিত গরীব আলফায (অপরিচিত ও অপ্রচলিত শব্দ) এর সঠিক অর্থ খুঁজে বের করতে হয় এবং বুঝতে হয়।
  • তারপর রাবীদের জীবন, তাদের মেধাশক্তি, বিচক্ষণতা, আদালত (এটি হাদীস শাস্ত্রের বিশেষ পরিভাষা। ইমানদারি ও আমানতদারিতার অবস্থা বলে আপাতত ব্যক্ত করা যেতে পারে। এর আলাদা সংজ্ঞা রয়েছে) সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে জানা। সমসাময়িক হাদিস ও জরাহ তাদিলে অভিজ্ঞ আলেমগণ রাবী সম্পর্কে কী মন্তব্য করেছেন তা জানা থাকা।
  • হাদিসের মান খুঁজে বের করা ।অর্থাৎ হাদিসটি সহীহ নাকি হাসান নাকি জয়ীফ তা জানা।
  • তারপর সর্বশেষ স্তর হলো ফিকহুল হাদীস তথা হাদীসে বর্ণিত শরয়ী মাসয়ালা ইত্যাদি জানা বা অর্থ বুঝা।
ধরুন আমি একজন সাধারন শিক্ষিত মানুষ। এখন এই শাস্ত্রীয় জ্ঞান কি আমার আছে? অন্তত একটা হাদীস বুঝতে হলে এই যে পাঁচটি করণীয়, তা ই কি আমার জানা থাকার কথা বা জানা আছে? বা এখন চাইলেই কি দুচারটি হাদীসের মুছত্বালাহাত্ব (পরিভাষা)র কিতাব এর বাংলা অনুবাদ পড়ে হাদিসের শাস্ত্রীয় এই জ্ঞান আমার দ্বারা অর্জন করা সম্ভব?
অবশ্যই সম্ভব না।
একটা শাস্ত্র জানতে হলে, এ সম্পর্কে মন্তব্য করতে হলে দীর্ঘ ও বিস্তৃত গভীর অধ্যয়নের পাশাপাশি সেই শাস্ত্রে পারদর্শী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তির দীর্ঘ সান্নিধ্য গ্রহন করতে হয়। পৃথিবীর তাবৎ জ্ঞান বিজ্ঞান ও শাস্ত্র সম্পর্কে একই কথা।
উদাহরনস্বরূপ আমরা চিকিৎসা শাস্ত্রের কথা বলতে পারি। একজন ডাক্তার দীর্ঘ ও বিস্তৃত গভীর অধ্যয়নের পরেও তাকে দীর্ঘ সময় একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে ইন্টার্নী করতে হয়। তারপর যখন তত্বাবধানকারী ডাক্তার ইন্টার্নি করা ডাক্তারকে যোগ্য মনে করে তখনই কেবল তাকে চিকিৎসার অনুমতি প্রদান করা হয়। তদ্রূপ শরয়ী শাস্ত্রগুলো সম্পর্কেও একই নীতি।
ইলমে হাদীস বা শরয়ি যেকোন শাস্ত্র সম্পর্কে এই বিষয়টি বরং আরো বেশি পরিমাণে লক্ষ্যণীয়। যেহেতু এগুলো ইলমে ওহী তথা ঐশী জ্ঞান সেহেতু তার নাযুকতার পরিমাণ আরো অনেক বেশী।
একজন ফক্বীহ বা মুফতীর জানা থাকতে হয় শরয়ী বিধানাবলী সম্পর্কিত সকল আয়াত-হাদীস। এবং তার আলোকে নির্ণীত সকল উসূলে ফিক্বহ এবং উসূলে ইফতাও আত্মস্থ থাকতে হয়। এর জন্য তিনি জীবনের এক তৃতীয়াংশ, কেউ জীবনের অর্ধেক এবং কেউ কেউ পুরো জীবনই উৎসর্গ করে থাকেন।
ইলমে শরীয়ত এমন এক বিশাল ভাণ্ডার, একজন মানুষ তার একশ বছরের যিন্দেগী এর পিছনে ব্যয় করলেও তার একটি শাস্ত্রই পড়াশুনা ও গবেষণা করে শেষ মার্গে পৌঁছা সম্ভব নয়।
ইমাম মালেক রহঃ এর মত মহান মুহাদ্দিস ও মুফতী আলেমেরও শরীয়তের কোন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি অধিকাংশ সময় বলতেনঃ লা আদরি (আমি জানিনা)।
কোন মাসয়ালা বলার সময় এতটাই ভয় পেতেন যে তাকে দেখে মনে হত তিনি জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থানে দাঁড়িয়ে আছেন। অথচ তিনি তার সময়ে শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও আলেম ছিলেন। মদীনায় একমাত্র তিনিই ফতোয়া প্রদান করতেন। তিনি কোন ফতোয়া প্রদান করলে অন্য কেউ আর সেই বিষয়ে কিছু বলতে সাহস করতেন না, তাঁর ফতোয়া ই সবাই গ্রহণ করে নিতো।
শরয়ি আহকাম নিয়ে গবেষণা করেই তাঁর সারাজীবন কেটেছে। এমন একজন গবেষক মহান ব্যক্তি যখন কোন গবেষণা ও শরয়ী মাসয়ালায় সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে এতটা ভীত ও সতর্কতা অবলম্বন করেন, শরয়ী গবেষণার নাযুকতার জন্য দ্বিতীয় কোন উদাহরণ উল্লেখ করার আর প্রয়োজন থাকেনা।
সুতরাং একজন সাধারণ শিক্ষিত মানুষ হিসেবে হাদীস বা শরয়ী কোন শাস্ত্র বা বিধান সম্পর্কে নিজে নিজে গবেষণা করতে যাওয়া বা নিজে থেকে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছা খুবই ভয়াবহ ও স্পর্শকাতর বিষয়। কারণ এক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই ভুল হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশী।
এবার সঙ্গতই প্রশ্ন আসে, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আমার করণীয় কী? এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় হচ্ছে এমন কোন আলেমের শরণাপন্ন হওয়া ,যিনি শরীয়তের বিষয়গুলো সম্পর্কে ওকীফহাল, এবং তার দ্বীনি আমানতদারিতা ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
তবে হ্যাঁ, ধীরে ধীরে শরীয়ত সম্পর্কে জানাশুনার চেষ্টা করা আমাদের কর্তব্য। উক্ত রচনার মূল উদ্দেশ্য শরয়ী বিধানাবলী নিয়ে অন্ধ থাকা নয়। বরং যথাযোগ্য আলেমের তত্বাবধানে থেকে শরীয়ত সম্পর্কে জানা।
কেননা শরীয়তের মাহত্ম আমাদের সাধারণ মস্তিষ্ক দিয়ে অনুধাবন করা বা জ্ঞানী ব্যক্তির তত্বাবধান ব্যতীত সকল আহকামের কারণ বুঝা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর কুরআনে কারীমের ইরশাদঃ “জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস করো যদি তোমরা না জানো।” (সূরা আন-নাহলঃ ৪৩)
শুধু কুরআনের অনুবাদ পড়ে এবং বাংলা বুখারি শরীফ পড়ে নিজে নিজে দ্বীন নিয়ে গবেষণা করা কতটা খতরনাক, তা বুঝানোর কিঞ্চিৎ প্রচেষ্টা এই লেখায়।আল্লাহ্‌ আমাদের সহীহ বুঝ দান করুন, আমিন।
লিখেছেনঃ হাফেয মাওলানা মাহমুদ সিদ্দিকী

বিঃ দ্রঃ মজার মজার রেসিপি ও টিপস, রেগুলার আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে লাইক দিন আমাদের ফ্যান পেজ আমার লাইফস্টাইল

Check Also

korbani

কোরবানির জরুরি মাসআলা : পর্ব ৫

জবাইয়ে একাধিক ব্যক্তি শরীক হলে মাসআলা : অনেক সময় জবাইকারীর জবাই সম্পন্ন হয় না, তখন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *